মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, চিন্তা করতে শেখায় - চাই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, চিন্তা করতে শেখায় - চাই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা
মোঃ আজমির ইবনে ইসলাম
---
প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমনকি চাকরির প্রস্তুতি পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত একটি মুখস্থনির্ভর কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে শিক্ষার্থীদের কীভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, বুঝতে হয়, কিংবা কীভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয় - তা শেখানো হয় না, বরং শেখানো হয় কীভাবে তথ্য মনে রাখতে হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু যে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে দমন করে, তা নয়; বরং সত্যি বলতে এটি এগুলোকে একদিক থেকে নিরুৎসাহিত করে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হলো - আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি - যারা হয়ে উঠতে পারত কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি নৈতিক মানুষ, কিন্তু দিনশেষে হয়ে উঠতে পারছে না।
শিশুকাল থেকেই আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের একরকম সবকিছু মুখস্থ করার চাপ দেওয়া হয় - যেমন: সূত্র, সংজ্ঞা, রচনা, প্রশ্নোত্তর, এমনকি মতামতও। অথচ, প্রত্যেক শিশু ভিন্ন ভিন্ন মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কেউ ভাষায় পারদর্শী, কেউ যুক্তিভিত্তিক চিন্তায়, কেউ বিশ্লেষণে, কেউ শিল্পে, আবার কেউ নেতৃত্বে। কিন্তু, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সবাইকে একই মুখস্থনির্ভর পথে চালিত করে এবং এই পার্থক্যগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। যার ফলে শিশুদের প্রশ্ন করার অভ্যাস হারিয়ে যায়, কৌতূহল নষ্ট হয় ও ভুল করার ভয় জন্মায়। ‘নিজে চিন্তা করা ঝুঁকিপূর্ণ, আর মুখস্থ করাই নিরাপদ’ - এই সত্তাকে শিশুরা মনের অজান্তেই ধীরে ধীরে শিখে ফেলে। এভাবে মেধা বিকাশের বদলে আমাদের দেশে মেধা ধ্বংস হতে থাকে।
আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষা প্রায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব পর্যায়েই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবুও, বাস্তব জীবনে আমাদের নৈতিকতার চরম অভাব এবং সর্বত্র আমরা ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি দেখতে পাই, যা আমাদের সামনে এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরে - “মুখস্থনির্ভর নৈতিক শিক্ষা কখনোই নৈতিক মানুষ তৈরি করতে পারে না।” শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা জীবনে প্রয়োগ করার জন্য শেখে না, বরং শেখে পরীক্ষায় লেখার জন্য। শিক্ষা যখন আত্মস্থ না হয়ে কেবল স্মরণ করার উপর জোর দেয় এবং সেই গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা শিক্ষার্থীদের আদর্শিক চরিত্র গঠন করতে ব্যর্থ হয়। পাওয়ার মধ্যে একটাই প্রাপ্তি - সেটা হলো সার্টিফিকেট।
অনেকেই তর্কের খাতিরে এখনো মনে করে যে বাংলাদেশের আগের শিক্ষা ব্যবস্থা খুব ভালো ছিল। বাস্তবে কিন্তু তা মোটেও ভালো ছিল না, বরং সেটি ছিল “খারাপের মধ্যে তুলনামূলক ভালো।” তখন সমস্যাগুলো চোখে পড়ত না কারণ সেসময় বিকল্প কম ছিল এবং বৈশ্বিক তুলনা সেভাবে ছিল না। আজকের দিনে যদি আমরা সেই ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অতীতের প্রতি নস্টালজিয়া অবশ্যই ভালো দিক, কিন্তু তা কখনোই গুণগত মানের প্রমাণ হতে পারে না।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়, তখন এই শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সেখানে তারা সাপ্তাহিক অ্যাসাইনমেন্ট, ওপেন ইন্ডেড কোশ্চেন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রব্লেম সলভিং এবং বিশ্লেষণধর্মী কাজে মারাত্মকভাবে হিমশিম খায়। তখন প্রশ্ন জাগে - “দেশে থাকতে তো তারা এত এত অ্যাসাইনমেন্ট করত, ভালো রেজাল্ট করত, ক্লাসটেস্ট, কুইজটেস্ট, এক্সাম দিতই - তাহলে সমস্যাটা কোথায়?” বাস্তব সত্যটা হলো - সেসব অ্যাসাইনমেন্টের বড় অংশ এর/ওর থেকে বা অন্য উৎস থেকে কপি করা হতো; কিছুটা বুঝেও সলভ করা হতো যদিও, তবে পুরোটাই শর্ট টাইমে পাড় করার জন্য এবং একটা ভালো মার্কস পাওয়ার আশায় সাবমিট করা হতো। কপি করাকে স্বাভাবিক কাজ হিসেবেই ধরা হতো। শিক্ষার্থীদের মনে হতো যে তারা ভালো করছে, কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদেরকেই হারিয়ে ফেলছিল।
শিক্ষাদানের পদ্ধতিও এই সমস্যাকে প্রতিনিয়ত আরও গভীর করে তুলছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষককে দেখা যায়, পুরো সেমিস্টারে তার প্রয়োজনীয় সব ক্লাস নেন না। তাড়াহুড়ো করে পুরো সিলেবাস অল্প কয়েকটি ক্লাসেই শেষ করে দেন যার ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয় মুখস্থের আশ্রয় নিতে এবং তাই তাদের মধ্যে বিষয়বস্তুর গভীরতা তৈরি হয় না। যেখানে বোঝার কোনো সুযোগ নেই, সেখানে মুখস্থ করাটাই বাঁচার প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা পড়া না বুঝলে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক এখনো মনে করেন, কোনো শিশু যদি নিয়ম ভাঙে বা পড়া না বোঝে, তবে তাকে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবক ও শিক্ষকরা স্বাভাবিক হিসেবে নিজেদের শৈশবের মারধরের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেন। যদিও প্রকাশ্য শারীরিক শাস্তি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সেই মানসিকতা এখনো সমাজে রয়ে গেছে। ভয়ভিত্তিক শিক্ষা আনুগত্য শেখায়, চিন্তা নয়, পাশাপাশি কৌতূহল ও আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে। যে শিশু ড্রইং করতে গিয়ে মনের সুখে রঙ নিয়ে হিজিবিজি আঁকতেই না পারলো, বাউন্ডারির বাইরে রঙ গেলেই তাকে বকা শুনতে হলো, সেই শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হবে কীভাবে? তার চিন্তাশক্তিকে কি চেপে ধরা হলো না? প্রশ্ন থেকেই যায়।
শিক্ষা আমাদের এখানে একমুখী হয়ে থাকে, যেখানে শিক্ষক শুধু বলেন আর শিক্ষার্থী শুধু মুখস্থ করেন। ফলে চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে না বললেই চলে। শিক্ষার প্রায় সব পর্যায়ে সমস্যা সমাধান বা আলোচনা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার কোনো স্থান নেই, বরং এসব খুবই বিরল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কারিকুলাম উন্নতমানের হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের সিস্টেম আমাদেরকে মুখস্থনির্ভর টেরিটোরিতেই বেঁধে রেখেছে। কারণ সেই প্রাইমারি থেকেই আমরা মুখস্থ করেই বড় হয়েছি, সেখান থেকে আর বের হতে পারছি না।
শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক কিছু (বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, এবং ও-এ লেভেল পরিচালিত) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভালো মানের শিক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ থেকে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত। এমন বৈষম্য একই দেশের ভেতরে সত্যিই দুঃখজনক। যদিও প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ভালোমানের পিটিআই প্রশিক্ষণ রয়েছে, কিন্তু তা কাঠামোগত বৈষম্যকে দূর করতে পারে না। একটি দেশ তখনই গর্ব করার অধিকার রাখে, যখন সেই দেশের সকল শিশু শিক্ষায় সমান সুযোগ পায়।
শিক্ষকরাও এই বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরের (ছোট ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের) শিক্ষকরা বেতন কমের পাশাপাশি সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত হন। যখন শিক্ষকরা নিজেরাই অবহেলিত ও অনিরাপদ বোধ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে সমাজ শিক্ষকদের সম্মান দেয় না, সে সমাজ উন্নত শিক্ষা কখনোই আশা করতে পারে না।
নিজ ভাষার পাশাপাশি খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজির অক্ষর, সাহিত্য ও গ্রামারের সাথে ভালোভাবেই পরিচিত - এমনকি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। তবুও আমাদের শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে ইংরেজিতে নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে বা কথা বলতে অনেকাংশেই হিমশিম খায়। এর কারণ হলো - আমাদের ইংরেজি শেখানো হয় একটি মুখস্থ বিষয় হিসেবে, ভাষা হিসেবে নয়। এই দুর্বলতার জন্যই কোচিং সেন্টারগুলো আইইএলটিএস, টোফেল ইত্যাদির জন্য হাজার হাজার কোচিং পিপাসু শিক্ষার্থীকে খুঁজে পায় - যারা মনে করে ইংরেজি বোধহয় আবার নতুন করেই ভালোভাবে শিখতে হবে। অথচ, শিক্ষার্থীরা অনেকটা ভুলেই যায় যে তারা সারা জীবন ইংরেজি পড়েই এ পর্যন্ত এসেছে। সত্যি বলতে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা তাদের আত্মবিশ্বাসকেই ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিয়েছে।
আরেকদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের এক রকম চাকরির চিন্তা শুরু হয়ে যায়। দারিদ্র্যতা ও দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী। জব রিলেটেড কোচিং সেন্টারগুলো প্রথম বর্ষ থেকেই তাদের কোচিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাতে অনেকটা সক্ষম হয়। যে সময়টায় শিক্ষার্থীদের নিজের একাডেমিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার কথা, ঠিক সেই মূল্যবান সময়টা চলে যায় চাকরির প্রস্তুতি নিতে নিতে। যার ফল ভয়াবহ। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে ভাগে কোনোমতে শুধু সিনিয়রদের নোট বা শীট পড়ে যায়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানহীন। চিন্তার শীর্ষ সময় হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, অথচ এই সময়টাতেই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ চাকরি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। ফলে দেশ তার সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলোকে হারায়। আর শিক্ষার্থীরা চাকরির প্রস্তুতি নেবেই বা না কেন- কারণ দেশ তো নিজস্ব ফিল্ডে পর্যাপ্ত জবের ব্যবস্থা করতে আজ পর্যন্ত ব্যর্থ। এবার আসি চাকরির পরীক্ষায়: নৈতিকতার প্রশ্নে ভালো নম্বর পেলেও চাকুরিতে জয়েন করার কিছুটা সময় পরেই অনেকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। যার মানে দাঁড়ায় - নৈতিকতা শেখা হয়েছে শুধু জব টা পাবার আশায়, উপলব্ধি করে নয়।
ছাত্র রাজনীতির কথা না বললেই নয়। এটি তাত্ত্বিকভাবে ভালো হলেও বাংলাদেশে তা প্রতিনিয়ত সহিংসতায় রূপ নেয়। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো - অনেক শিক্ষকও দলীয় রাজনীতিতে জড়িত। যেখানে একজন শিক্ষকের কথা ও কলম একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারত, সেখানে তারা পক্ষপাতদুষ্টের ভূমিকা পালনে ব্যস্ত সময় কাটায়। পক্ষ নেওয়া দোষের কিছু না, তবে যেটা খারাপ, তাকে খারাপ বলতে পারা, আর যা ভালো, তাকে ভালো বলতে পারা দরকার, যা অনেকেই ভুলে যান।
এই সব সমস্যার সমাধান একটাই, সেটা হলো - শিক্ষার সংস্কার। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের এই মুহূর্তে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে) প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের ক্রিয়েটিভিটি, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, কমিউনিকেশন স্কিল, কোয়ান্টিটেটিভ রিজনিং, এবং সর্বোপরি এথিকাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর ওপর জোর দিতে পারে। দরকার এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার যেখানে ছোট থেকেই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন ভাষা, সাহিত্য, গণিত, ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কলা, মানবিক, ব্যবসা, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি আনন্দ নিয়ে শিখতে পারবে। এর ফল আমরা এখনই পাব না, কিন্তু আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে সমাজ স্থিতিশীলতার দিকে পৌঁছাতে শুরু করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটতে শুরু করবে। তাই, আমাদের তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার এটাই সময়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কীভাবে চিন্তা করতে শিখছি তার ওপর, কতটুকু মুখস্থ করতে পারলাম তার ওপর নয়।
---
মোঃ আজমির ইবনে ইসলাম
Comments
Post a Comment