নির্বাচন প্রেক্ষাপট


নির্বাচন প্রেক্ষাপট

মোঃ আজমির ইবনে ইসলাম

---
কাল বাদে পরশু দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরিস্থিতি এবার কিছুটা ভিন্ন। সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে দেখলে, বিএনপি এবং জামাত (জোট)- দুটোই খুব শক্ত অবস্থানে আছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই দু’টির কোনো একটিতেই যাচ্ছে। তবে, বামপন্থী জোট, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পৃথকভাবে অংশগ্রহণ - নির্বাচনী মাঠকে অনেকটাই ফ্র্যাগমেন্ট করে তুলেছে, এবং এই ফ্র্যাগমেন্টেশনের জন্য বিএনপি কিছুটা এগিয়ে। প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক মহিলা, অর্থাৎ সংখ্যাটা প্রায় সমানে সমান। তাই, নারী ভোটারদের ভূমিকা বরাবরের মতো এবারও সত্যিই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে আবার মোট ভোটারের বিশাল অংশই তরুণ। নতুন ভোটারের সংখ্যাটাও নেহাত কম না - প্রায় ৪৫ লাখের বেশি। আবার, বয়সভিত্তিক বিবেচনায়, মোট ভোটারের প্রায় ৪৪% এর মতো ভোটার ‘১৮ থেকে ৩৭’ বছরের মধ্যে, সংখ্যা হিসেবে সেটা প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ প্লাসের কাছাকাছি। বাংলাদেশের সিনিয়র সিটিজেনরা সাধারণত অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কোনো একটা নির্দিষ্ট দলের প্রতি আনুগত্য ও দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ভোট দিবে, কিন্তু তরুণদের ক্ষেত্রে চিত্রটা আলাদা। তারা বরং বর্তমান বাস্তবতা যেমন চাকরির বাজার, অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ইত্যাদির দিকেই বেশি তাকাচ্ছে। তাদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাটা একটু বেশি এবং তারা নতুন নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। যার ফলে, বর্তমানে রাজনীতি ধীরে ধীরে অতীতের স্মৃতিনির্ভরতা থেকে আগামীর প্রত্যাশার দিকে সরে যাচ্ছে, যা নির্বাচনের পুরো প্লটকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এই নির্বাচনে তরুণ নেতাদের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জুলাই আন্দোলনের একটা বড় অর্জন হলো – জুলাই পরবর্তী সময়ে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ব্যাপক ভাবে জাগ্রত হয়েছে ও এনসিপির মাধ্যমে নেতৃত্বের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। যার ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ তার আগামীর লিডারদের খুঁজে পেয়েছে। তবে, বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে হয়তো এখনই তাদের অনেকেই প্রথম নির্বাচনে সফল বা জয়ী হবে না, তবে এটুকু নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, তারাই এদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এবারের নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ইতোমধ্যে ভোট দিতে পেরেছে। যদিও সংখ্যায় তারা মোট ভোটারের খুব ছোট অংশ – এক শতাংশেরও কম – তবুও দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার মানে হলো – দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় তাদেরকে অংশীদার করা। আরেকটি বড় বিষয় হলো - এবার সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ, ভোটাররা যে শুধু - কে ক্ষমতায় যাবে? - তা নয়, বরং - রাষ্ট্রের কাঠামো কীভাবে বদলাবে? - সেটিও নির্ধারণ করতে পারছে। যদিও অনেকের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবে আপাতদৃষ্টিতে এই মুহূর্তে বলা যায় যে, ‘হ্যাঁ/না’-এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ এগিয়েই থাকবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ এগিয়ে থাকলেও, নির্বাচনের ফলাফল ডিপেন্ড করছে নতুন ও তরুণ ভোটারদের চিন্তাধারার উপরে। তবে, যে পক্ষই জিতুক না কেন, বিজিত পক্ষ কি নির্বাচনের ফলাফলকে বৈধতা দেবে? উত্তর হলো ইয়েস, দিতে বাধ্য। কারণ, এই নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে, তাই জনগণই এর বৈধতা দিবে বা দিচ্ছেও। সত্যি বলতে, প্রজন্ম বদলাচ্ছে, মানসিকতা বদলাচ্ছে এবং সর্বোপরি রাজনীতির অর্থ বদলাচ্ছে। ভোটারদের রেশিও, তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, প্রবাসীদের অংশগ্রহণ এবং একই সাথে সাংবিধানিক গণভোট – এই সবকিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে একটি পরিবর্তনের মুহূর্ত বলাই যায়। তাই, দেখা যাক তরুণ প্রজন্ম ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে কোন দিকে নিয়ে যায়? সময়ের অপেক্ষা শুধু।

---

মোঃ আজমির ইবনে ইসলাম 


Comments

  1. অসাধারণ নির্বাচনী বিশ্লেষণধর্মী লেখনী

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আমাদের সম্পদ, তারা ফেলনা বা অযোগ্য নয়

মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, চিন্তা করতে শেখায় - চাই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা

Dynamical Systems: a window to understand every changes