রিইউনিয়ন, আড্ডা আর স্মৃতিচারণ
রিইউনিয়ন, আড্ডা আর স্মৃতিচারণ
আজমির ইবনে ইসলাম (নাইস), ১১ ব্যাচ
--------------------------------------------------
যতগুলো বছরই পেরিয়ে যাক না কেন, চোখ বন্ধ করলেই যেন প্রায় সময় ভেসে ওঠে সেই চিরচেনা দৃশ্য - খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজে ঘেরা মনোরম ক্যাম্পাস আর সেট স্কুলের নিচতলার আমাদের সেই প্রিয় গণিত ডিসিপ্লিন। আজ এই গ্র্যান্ড রিইউনিয়নের বদৌলতে মনে পড়ছে সেই ক্যাম্পাসের প্রথম দিনটির কথা যেদিন ছিল সবাই অচেনা। কিন্তু ধীরে ধীরে ডিসিপ্লিন, ক্লাসরুম, ক্লাসমেট, সিনিয়র, জুনিয়র এই কিওয়ার্ড গুলো আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অনেকটা বলতে গেলে স্কুল বা কলেজ জীবনের থেকে আলাদা। হাইস্কুলে পাঁচ বছর সময় কাটলেও সেখানে অনেকটা পরিবারের শাসনের মধ্যেই থাকা লাগত, আবার কলেজ লাইফের দেড়-দুই বছর শুরু হতে না হতেই কেমন যেন শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সেদিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সময়টা একদিক থেকে যেমন লম্বা, অন্যদিক দিয়ে থাকে না কোনো শাসন। তাই নিজেকে পরিপূর্ণভাবে আবিষ্কার করতে পারা যায়। আর ঠিক সেই সূত্র ধরে ক্যাম্পাসে কাটানো মুহূর্ত গুলো আমাদের নিজেদেরকে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছিল। ক্লাসরুম গুলো ছিল লেকচারের পাশাপাশি বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার ক্ষেত্র, সাথে এক অবারিত স্বপ্ন দেখার আসর। ক্লাসের ফাঁকে ডিসিপ্লিনের করিডোর, ল্যাব বা সেমিনার লাইব্রেরিতে চলত পরের ক্লাসের জন্য অপেক্ষা। ক্যাফেটেরিয়া আর ক্যাম্পাসের ভেতরের বা বাইরের চায়ের দোকান গুলো ছিল এক অঘোষিত মিলনমেলা, যেখানে কখনো হতো ক্লাসটেস্ট নিয়ে আলোচনা, আবার কখনো হতো আগামী দিনের পরিকল্পনা, অথবা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই আড্ডাবাজিতে মেতে ওঠা। প্রতিটা চায়ের কাপ যেন সাক্ষী হয়ে থাকত আমাদের সেই হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দঘন মুহূর্তের। হল-লাইফ ছিল এক আলাদা অনুভূতি, যেখানে রাত জেগে পাল্লা দিয়ে চলত গল্প আর খুনসুটি। পরদিন ক্লাসটেস্ট বা ফাইনাল এক্সাম থাকলে তো কথাই নাই - হলের কোনো একটা রুমে সবাই মিলে বসে প্রিপারেশন নেওয়ার মজাটাই ছিল আলাদা। হলের গেস্টরুম ছিল অন্যরকম এক ভালোবাসার জায়গা, যেখানে চলত পরের দিনের ইন্টার-ডিসিপ্লিন ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচের পরিকল্পনা, অথবা চলত ওয়ান-ডে বা সেভেন-ডেইস ট্যুরের প্লানিং। খেলার মাঠে যেমন একদিকে থাকত নিজ ডিসিপ্লিনের প্রতি ব্যাপক টান, অন্যদিকে বিপক্ষ টিমের বন্ধুবান্ধবদের সাথে সাময়িক উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। ডিসিপ্লিন ও ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে এরকম হাজারো স্মৃতি একটার পর একটা লেখা যাবে। প্রত্যেকের নিজস্ব গল্প আছে এ নিয়ে এবং আমাদের এই রিইউনিয়ন সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলোকে আজ নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করছে। তাই, এই পুনর্মিলন শুধু একসাথে হওয়া নয়, বরং একরকম নিজেদের আনন্দটাকে আরেকটা বারের মত দ্বিগুণ করে নেওয়া। গণিত ডিসিপ্লিন ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের শুধু ডিগ্রি দেয়নি, দিয়েছে বন্ধুত্বের মত শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি, ক্লোজ সিনিয়রদের ভরসা, আর জুনিয়রদের মায়া ও ভালোবাসা। এইসব মিলিয়ে আমরা আজও একটা পরিবার। ইশ্ !!! এই রিইউনিয়নে আমাদের ‘পুরোনো স্মৃতিচারণ’ আর ‘আড্ডাবাজির’ ইন্টেন্সিটি যদি পরিমাপ করা যেত, কতই না ভালো হতো, তাই না? আদৌ কি এই পরিমাপ করা সম্ভব? উত্তর হলো: ‘হ্যাঁ’। কারণ, ভুলে যাবেন না - আমরা কিন্তু Mathematician... তাই এইসব ক্যালকুলেশন আমরা করব না তো কারা করবে? ম্যাথম্যাটিকস-এর রিইউনিয়ন যেহেতু, তাই একটু ছোটখাটো ম্যাথমেটিকাল ডিসকাশন না থাকলে কেমন যেন পূর্ণতা পায় না। তবে চলুন, মেজারমেন্ট করেই নেওয়া যাক: সংযুক্ত ফিগারটি তুলে ধরছে এই দু’দিন ব্যাপী রিইউনিয়নে আমাদের ‘আড্ডা’ আর ‘স্মৃতিচারণ’ কেমন হবে তার ডাইনামিকস। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রিইউনিয়নের কল্যাণে আমরা যদি সবাই এক সাথে ক্যাম্পাসের কোনো চায়ের দোকানে, নতুন ক্যাফেটেরিয়ায় বা ম্যাথ ডিসিপ্লিনের নিচতলায় মিলিত হই, এবং আমাদের নিজেদের মধ্যে (চা-নাস্তা-কফির পাশাপাশি) কথোপকথন শুরু করি, তাহলে স্বভাবতই আমরা যেহেতু অনেকদিন পর একসাথে হয়েছি, তাই বসে আড্ডা দিতে চাইব, আর স্মৃতিচারণ করতে চাইব। গণিত বলে, ‘‘শুরুর দিকে ‘আড্ডা’ আর ‘স্মৃতিচারণ’ তেমন একটা পারসেন্টেজ না দেখালেও, অল্প কিছু সময়ের মধ্যে এই দুই ভ্যারিয়েবল একটা লেভেলে পৌঁছে পালাক্রমে পিরিওডিক আকারে ঘুরপাক খেতে থাকবে।’’ এর অর্থ হলো, আড্ডার মধ্যে এক দুই চুমুক চা, আর পুরাতন এক একটা স্মৃতি নতুন করে আমাদের মধ্যে হাজির হওয়া... আবার এক দুই চুমুক চায়ের জাদুকরী প্যারামেট্রিক প্রভাব, কিছুক্ষণ দীর্ঘশ্বাস, আবার পুরোনো একটা গল্প। এভাবে আড্ডা চলমান, সাথে স্মৃতিচারণও কন্টিনিউয়াস। গণিতের যে শাখায় এইসব রিয়াল লাইফ বিষয় গুলোকে ডিজাইন ও অ্যানালাইস করা হয়, সেটাকে আমরা ‘ম্যাথমেটিকাল মডেলিং’ বলে থাকি। তাই, এই ফিগারে আমরা শুধু গ্রাফ বা ইকুয়েশনের রেজাল্ট দেখছি না, পুরোনো দিনের যে স্মৃতি গুলো সাবকনশাস মাইন্ডে সুপ্ত ছিল, সেগুলো যে এই গ্র্যান্ড রিইউনিয়নের মাধ্যমে আবারো জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তার ফ্রিকোয়েন্সির ইন্টারপ্লে দেখছি। ধন্যবাদ অর্গানাইজিং কমিটিকে ব্যস্ততার ভিড়ে এই সুন্দর আয়োজনের জন্য, অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য।
Animation-link: https://youtu.be/DmzkVt1r990

Comments
Post a Comment